আমাদের পিতা ঈশ্বর এবং প্রভু যীশু খ্রীষ্টের অনুগ্রহ ও শান্তি আপনাদের সহবর্তী হোক। আজ আমরা ক্রুশ চিহ্নের মাধ্যমে আমাদের এই প্রার্থনা শুরু করি এবং ঈশ্বরের জীবন্ত উপস্থিতিতে নিজেদের সমর্পণ করি।
হে প্রভু, আপনি আমাদের অন্তরের গোপন বেদনা জানেন — প্রভু, দয়া করুন। হে খ্রীষ্ট, আপনি আমাদের অশ্রু ও দীর্ঘশ্বাসের অংশীদার হন — খ্রীষ্ট, দয়া করুন। হে প্রভু, আপনি আমাদের বিশ্বাসের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখেন — প্রভু, দয়া করুন।
রাতের অন্ধকারের কথা ভাবুন …
একটি নিস্তব্ধ ঘর। বাইরে বাতাসের মৃদু শব্দ। ঘরের কোণে একটি ছোট টেবিলের ওপর জ্বলছে একটিমাত্র মোমবাতি। সেই মোমবাতির কম্পমান আলোয় দেওয়ালের গায়ে একটি ছায়া দীর্ঘ হয়ে ফুটে উঠেছে। সেই ছায়াটি একজন মায়ের। তিনি ঘুমাচ্ছেন না। তাঁর চোখের পাতা ভারী হয়ে এসেছে, কিন্তু তাঁর হৃদয় সম্পূর্ণ জেগে আছে। তিনি তাঁর দুই হাত জোড় করে প্রার্থনা করছেন। তাঁর গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। এই মা আর কেউ নন, তিনি হলেন সাধু মোনিকা, যাঁর স্মৃতি আজ আমরা মণ্ডলী হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে পালন করছি।
সাধু মোনিকা দীর্ঘ ত্রিশটি বছর ধরে এই জাগরণ রক্ষা করেছিলেন। তিনি তাঁর স্বামী এবং তাঁর পুত্র অগাস্টিনের জন্য প্রতিদিন, প্রতি রাতে অশ্রু বিসর্জন করে প্রার্থনা করেছিলেন। তিনি জানতেন না ঈশ্বর কখন তাঁর প্রার্থনা শুনবেন। তিনি জানতেন না তাঁর পুত্র কবে ঈশ্বরের আলোয় ফিরে আসবে। কিন্তু তিনি জেগে ছিলেন। তিনি তাঁর ভালোবাসার প্রহরা থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরে যাননি।
আজকের সুসমাচারে প্রভু যীশু আমাদের এই জেগে থাকার কথাই বলছেন: “জেগে থাকো! কারণ তোমরা জানো না কোন দিন তোমাদের প্রভু আসবেন।”
জেগে থাকা বলতে যীশু কেবল শারীরিক অনিদ্রার কথা বলেননি। এই জেগে থাকা হলো ভালোবাসার এক অনন্য ভঙ্গি। এটি হলো সেই হৃদয়ের অবস্থা, যা কখনো আশা হারায় না, যা অন্ধকারের মধ্যেও আলোর অপেক্ষায় প্রহর গোনে। এটি হলো একজন মায়ের প্রার্থনা, একজন বাবার নীরব অপেক্ষা, এবং ঈশ্বরের প্রতি আমাদের গভীর বিশ্বস্ততা।
আজকের এই পবিত্র দিনে, যখন আমরা সাধু মোনিকার সেই অশ্রুসিক্ত অথচ বিজয়ী ভালোবাসার কথা স্মরণ করছি, তখন আমাদের হৃদয় এক গভীর নীরবতায় ছেয়ে যায়।
আজ ২৭শে আগস্ট, ২০২৬। গত ১৩ই জুন আমাদের আদরের বেঞ্জামিন ভো, আমাদের সবার প্রিয় বেন, আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আজ প্রায় আড়াই মাস হতে চলল।
আমি জানি, এই আড়াই মাস বা প্রায় পঁচাত্তরটি দিন আপনাদের জন্য কতটা দীর্ঘ ছিল। শোকের প্রথম দিকের সেই কোলাহল, মানুষের সান্ত্বনার ভিড় এখন হয়তো অনেকটাই শান্ত হয়ে এসেছে। আর এখন নেমে এসেছে সেই আসল নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতা, যা বেনের শূন্য ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। সেই নিস্তব্ধতা, যা বেনের পড়ার টেবিল, তার কিবোর্ড, আর তার সেই প্রিয় জিনিসগুলোর ওপর ধুলোর মতো জমে থাকে।
সত্যিটা বলতে কোনো দ্বিধা নেই। এই সময়ে এসে সান্ত্বনা দেওয়া খুব কঠিন। কারণ, ফাঁকা চেয়ারটি এখনও ওভাবেই পড়ে আছে। প্রিয় অ্যালান, প্রিয় থাও — আপনাদের বুক চিরে যে কান্না আসে, তা কোনো সাধারণ কথায় মুছে ফেলা যায় না। আপনাদের মনে হতে পারে, এই আড়াই মাস ধরে আপনারা এক দীর্ঘ, ক্লান্তিকর রাতের প্রহরায় দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে সকালের আলো যেন কিছুতেই ফুটতে চাইছে না।
কিন্তু ঠিক এই অন্ধকারের মাঝেই আজকের প্রথম পাঠের সেই সুন্দর বাক্যটি আমাদের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালায়। সাধু পৌল করিন্থীয়দের লিখছেন: “ঈশ্বর বিশ্বস্ত, যাঁর দ্বারা আপনারা তাঁর পুত্র আমাদের প্রভু যীশু খ্রীষ্টের সহভাগিতায় আহ্বানপ্রাপ্ত হয়েছেন।”
ঈশ্বর বিশ্বস্ত। যখন আমাদের চারপাশের সমস্ত কিছু ভেঙে পড়ে, যখন আমাদের নিজেদের শক্তি ফুরিয়ে যায়, তখনও ঈশ্বরের বিশ্বস্ততা আমাদের ধরে রাখে। তিনি আমাদের একা ছেড়ে দেননি।
আসুন, আজ আমরা আমাদের প্রিয় বেঞ্জামিনের জীবনের একটি অত্যন্ত সুন্দর ও গভীর দিকের দিকে তাকাই। বেন ছিল প্রখর মেধার অধিকারী, এক অসাধারণ কিশোর। কিন্তু তার এই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার চেয়েও যা আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে, তা হলো তার অন্তরের গভীর সহানুভূতিশীল ও কোমল হৃদয়।
বেনের বয়স যখন মাত্র বারো বছর, তখন তার বাবার ৪০তম জন্মদিন উদযাপিত হচ্ছিল। চারদিকে আনন্দ, উৎসব, হাসাহাসি। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেও ছোট্ট বেনের চোখে জল এসে গিয়েছিল। সে তার বাবাকে হারানোর এক অকাল ভয়ে কেঁদে ফেলেছিল। মাত্র বারো বছরের একটি ছেলের পক্ষে এই ধরনের গভীর অনুভূতি প্রকাশ করা কি সাধারণ বিষয়? না। এটি ছিল তার হৃদয়ের সেই গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। সে তার বাবাকে এতটাই ভালোবাসত, তার পরিবারের সাথে তার বন্ধন এতটাই গভীর ছিল যে, সে তার বাবার সামান্যতম বিচ্ছেদের কথা কল্পনা করেও কেঁদে ফেলেছিল।
এই যে বেনের অশ্রু, এটি কিন্তু দুর্বলতা ছিল না। এটি ছিল তার ভালোবাসার জাগরণ। সে তার হৃদয়ে এক গভীর প্রহরা বয়ে বেড়াত — তার মা, তার বাবা, এবং তার ভাই রায়ানের জন্য এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রহরা।
আজ সাধু মোনিকার এই স্মৃতি দিবসে বেনের সেই অশ্রুর কথা মনে পড়া খুব স্বাভাবিক। মোনিকা যেমন ভালোবাসার টানে অশ্রু ফেলেছিলেন, আমাদের প্রিয় বেনও তেমনি তার পরিবারের প্রতি গভীর ভালোবাসার টানে কেঁদেছিল। সে ছিল এমন এক সন্তান, যে তার মা-বাবার হৃদয়ের স্পন্দন বুঝতে পারত।
মাঝে মাঝে এই ধরনের গভীর শোকের রাতে, পিতা-মাতার মনে এক অদ্ভুত এবং ভারী পাথর চেপে বসে। মনের অলক্ষে এক নীরব অপরাধবোধ আমাদের গ্রাস করতে চায়। আমরা ভাবতে শুরু করি, “আমি কি আরও একটু ভালো করতে পারতাম? আমি কি কোনো লক্ষণ মিস করেছি? কেন আমি আমার সন্তানকে বাঁচাতে পারলাম না?”
আজ যীশুর সেই পরম সত্যটি আপনাদের হৃদয়ে গ্রহণ করুন। যীশু যখন সেই অন্ধ লোকটিকে দেখেছিলেন, শিষ্যরা জিজ্ঞেস করেছিল, “কার পাপের জন্য এমন হলো?” যীশু স্পষ্ট করে বলেছিলেন, “কারো পাপের জন্য নয়।”
প্রিয় অ্যালান, প্রিয় থাও — বেনের এই চলে যাওয়া কোনো অবহেলা বা ভুলের শাস্তি নয়। ঈশ্বর কখনো রোগ বা মৃত্যু পাঠান না। এই পৃথিবীতে কিছু দুঃখ সম্পূর্ণ আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে আসে। আপনারা বেনকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তা ছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা। আপনারা তার সাথে বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন, তার শখের বোয়িং ৭৩৭ প্লেন দেখার জন্য এয়ারপোর্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েছেন, তার স্বপ্নগুলোকে ডানা মেলতে সাহায্য করেছেন। আপনারা কোনো ভুল করেননি। আপনাদের ভালোবাসা ছিল নিখুঁত। আজ সেই অপরাধবোধের পাথর হৃদয় থেকে ফেলে দিন। ঈশ্বর আপনাদের অন্তরের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখেছেন, যেমন তিনি সাধু মোনিকাকে দেখেছিলেন।
আজকের সুসমাচারে যীশু বলছেন, “ধন্য সেই দাস, যাকে তার প্রভু এসে সেই কাজ করতে দেখবেন।”
আমাদের প্রিয় বেন তার ১৫ বছরের জীবনে সেই বিশ্বস্ত দাসের মতোই কাজ করে গেছে। সে তার মেধা, তার কোডিংয়ের দক্ষতা, তার খেলাধুলার প্রতি নিষ্ঠা — সবকিছুর মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের দেওয়া উপহারের সদ্ব্যবহার করেছে। সে কখনো অলস বসে থাকেনি। সে সবসময় প্রস্তুত ছিল। তার সেই মিষ্টি হাসি, তার গলার সিলভার ক্রুশ চেইনটি — সবকিছুই প্রমাণ করে যে সে ঈশ্বরের সান্নিধ্যে বাস করত।
অ্যালান, আপনার সেই স্বপ্নের কথা মনে পড়ে, যা আপনি ২৫শে জুন দেখেছিলেন? বেন সুস্থ, সবল, কোনো কষ্ট ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছে। সে আপনাকে জড়িয়ে ধরে বলছে, “বা ও, টেস্ট নাও কোন কিছুতেই আমি আটকাইনি। আমি ঠিক আছি।” এবং তারপর সে বলছে, “কোনো সমস্যা নেই, আমি তোমাদের দিকে নজর রাখব।”
এটি কেবল কোনো স্বপ্ন নয়। এটি হলো বেনের পক্ষ থেকে আপনাদের জন্য এক স্বর্গীয় বার্তা। বেন আজ স্বর্গের সেই চিরন্তন আবাসে, সাধু কার্লো আকুত্তিসের সাথে প্রভুর ভোজসভায় আনন্দ করছে। সে আজ আর কোনো অসুস্থতার মধ্যে নেই, কোনো কষ্টের মধ্যে নেই। সে আজ মুক্ত, আকাশের সেই বোয়িং ৭৩৭ বিমানের চেয়েও দ্রুত গতিতে সে আজ ঈশ্বরের মহিমায় উড্ডীন। এবং সে সেখান থেকে আপনাদের দেখছে। সে আপনাদের জন্য প্রার্থনা করছে।
রায়য়ান, আমার স্নেহের ছোট ভাই — তোমার দাদা বেন তোমাকে কতটা ভালোবাসত, তা তুমি জানো। তোমরা একসাথে কত খেলেছ, কত হেসেছ। আজ তোমার দাদা শারীরিকভাবে তোমার পাশে নেই, কিন্তু তার সেই লড়াকু মনোভাব — “চেষ্টা করাই আসল কথা” (trying is all that matters) — তা সে তোমার হৃদয়ে রেখে গেছে। তুমি তোমার বাবা-মায়ের পাশে এক শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়াও। তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করো, খেলাধুলা করো। তোমার প্রতিটি হাসিতে, তোমার প্রতিটি সাফল্যে বেনের স্মৃতি জীবন্ত থাকবে।
আজ দূর-দূরান্ত থেকে যারা আমাদের এই প্রার্থনায় যুক্ত হয়েছেন — বিশেষ করে যে পরিবারগুলো কোনো অসুস্থতার সাথে লড়াই করছেন, যারা কোনো প্রিয়জনকে হারিয়ে গভীর শোকের ক্রুশ বহন করছেন — আপনারা জেনে রাখুন, ঈশ্বর আপনাদের দেখছেন। তিনি আপনাদের রাতের সেই নীরব অশ্রু চেনেন। সাধু মোনিকার মতো আপনারাও আপনাদের প্রার্থনা চালু রাখুন, কারণ ঈশ্বর বিশ্বস্ত।
আসুন, আজকের এই পবিত্র লিটার্জি থেকে আমরা একটি ছোট কিন্তু গভীর সত্য আমাদের সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরি।
আমরা যেন আমাদের জীবনে ‘জেগে থাকার’ এই অভ্যাসটি গড়ে তুলি। জেগে থাকা মানে কেবল জেগে থাকা নয়, এর অর্থ হলো ভালোবাসায় সজাগ থাকা। আজ যখন আপনারা বাড়ি ফিরবেন, আপনাদের পরিবারের সদস্যদের দিকে তাকান। তাদের ভালোবাসুন, তাদের সময় দিন। বেনের মতো এক কোমল ও সহানুভূতিশীল হৃদয় নিয়ে একে অপরের পাশে দাঁড়ান।
ভিয়েতনামের সিয়া মাউ-তে বেনের নামে উৎসর্গীকৃত সেই ‘ভালোবাসার কূপ’ (Giếng Gioan Baotixita) থেকে যেভাবে আজ তৃষ্ণার্ত মানুষের জন্য জীবনদায়ী জল বয়ে চলেছে — তেমনি আমাদের জীবন থেকেও যেন বেনের স্মরণে ভালোবাসার ধারা প্রবাহিত হয়।
প্রভু যীশু খ্রীষ্টের পরম শান্তি আপনাদের গৃহ ও হৃদয়কে পূর্ণ করুক। ধন্য কুমারী মারীয়া তাঁর মাতৃত্বের আঁচল দিয়ে আপনাদের সমস্ত ক্ষত ঢেকে রাখুন। এবং আমাদের প্রিয় বেজ্জামান ভো স্বর্গের সেই চিরন্তন আলোয়, সাধু মোনিকা ও সাধু কার্লোর সাথে প্রভুর সান্নিধ্যে শান্তিতে বিশ্রাম করুক।
আমেন।
For the intentions entrusted to Ben on our prayer wall:
🕯 প্রার্থনা প্রাচীরে আপনার নিজের প্রার্থনা প্রজ্জ্বলিত করুন →
মুক্তিদাতার আজ্ঞায় এবং ঐশ্বরিক শিক্ষায় গঠিত হয়ে, আমরা বলতে সাহস করি:
স্বর্গস্থ আমাদের পিতা, তোমার নাম পূজিত হোক। তোমার রাজ্য আসুক। তোমার ইচ্ছা যেমন স্বর্গে, তেমনি পৃথিবীতেও পূর্ণ হোক। আমাদের প্রয়োজনীয় রুটি আজ আমাদের দাও, এবং আমাদের অপরাধ ক্ষমা করো, যেমন আমরা আমাদের অপরাধকারীদের ক্ষমা করি; এবং আমাদের প্রলোভনে পড়তে দিও না, কিন্তু মন্দ থেকে আমাদের রক্ষা করো। আমেন।
প্রভু আপনাদের আশীর্বাদ করুন এবং সমস্ত অমঙ্গল থেকে রক্ষা করে অনন্ত জীবনে নিয়ে যান। আমাদের প্রিয় বেঞ্জামিন এবং সকল বিশ্বাসী মৃত আত্মারা ঈশ্বরের দয়ায় শান্তিতে বিশ্রাম করুক। আমেন।
✝ সর্বশক্তিমান ঈশ্বর আপনাদের আশীর্বাদ করুন: পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার নামে। আমেন।